গত দুই দশকে ক্যালিফোর্নিয়ায় রাজ্যব্যাপী কোনো নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী জয়ী হতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি রাজ্যটির মানুষের বিরূপ মনোভাবের কারণে এবারও রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনা কম বলে মনে করা হচ্ছে।
খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
এমন পরিস্থিতিতে গভর্নর হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন স্টিভ হিলটন। যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ৫৭ বছর বয়সী এই রক্ষণশীল রাজনীতিক ও সাবেক টেলিভিশন ভাষ্যকার মনে করেন, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্যালিফোর্নিয়ার পরবর্তী গভর্নর হতে পারবেন।
ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হিলটন ‘ক্যালিফোর্নিয়ার স্বপ্ন’ পূরণের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। ২০২১ সালে তিনি মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন।
এখন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ডেমোক্র্যাট-অধ্যুষিত অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়ার বিদায়ী ডেমোক্র্যাট গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কঠিন লড়াইয়ে নেমেছেন।
তবে হিলটনের দাবি, নিউসমের শাসনে ক্যালিফোর্নিয়ার পরিস্থিতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিলটন বলেন, তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চান, যেখানে মানুষ আবার নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।
তার ভাষায়, ‘অতিরিক্ত ফুলেফেঁপে ওঠা, মানুষের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া আমলাতান্ত্রিক সরকারের’ কারণে মানুষকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অথচ তারা দেশের সবচেয়ে নিম্নমানের সেবা পাচ্ছে।
তবে ক্যালিফোর্নিয়ায় হিলটনের জন্য বড় একটি রাজনৈতিক বাধা রয়েছে—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন।
রাজ্যটিতে নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট ভোটারের সংখ্যা রিপাবলিকানদের প্রায় দ্বিগুণ। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে আসার মধ্যে হিলটনকে একদিকে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের সমর্থন ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে ট্রাম্পবিরোধী ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটারদেরও পরিবর্তনের স্লোগানে রিপাবলিকানদের পক্ষে টানতে হবে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগো ক্যাম্পাসের রাজনীতিবিজ্ঞানের অধ্যাপক থ্যাড কুসার এএফপিকে বলেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ায় রিপাবলিকান পার্টির জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ধরনের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল অঙ্গরাজ্যটির ভোটারদের মন জয়ের জন্য ট্রাম্প বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেননি। সম্প্রতি তিনি এমন মন্তব্যও করেছেন, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
তার বক্তব্য ছিল, ইরান চাইলে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোতে হামলা চালিয়ে ‘ধ্বংস করে দিতে পারে’।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে হিলটন সরাসরি অবস্থান না নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা বলেন। তিনি শহরটিকে আবার প্রাণবন্ত করে তোলার অঙ্গীকার করেন।
হিলটন বলেন, ‘আমি এই সমর্থন চাইনি। এটি পেয়ে আমি বিস্মিত হয়েছি এবং সম্মানিত বোধ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেখানে সম্ভব, সেখানে সরকারের আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সীমিত রাখা উচিত—এ বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক।’
তবে ট্রাম্পের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তার মতপার্থক্য রয়েছে বলেও জানান হিলটন। এর মধ্যে ২০২০ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ী হওয়ার মিথ্যা দাবিও রয়েছে।
হিলটনের দাবি, ভোটাররা ট্রাম্পের বিরোধী হয়েও তাকে ভোট দিতে পারেন।
নিজেকে একজন ‘বহিরাগত’ বা প্রচলিত রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের মানুষ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার ‘বিদ্রোহী মানসিকতা’ কাজে লাগিয়ে রাজ্যটিকে ব্যবসাবান্ধব করে তুলতে চান।
এ জন্য তিনি বিধিবিধানের জটিলতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইরানকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যয়বহুল আবাসস্থল ক্যালিফোর্নিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য হিলটন মূলত অতিরিক্ত সরকারি বিধিনিষেধ ও করকে দায়ী করছেন।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেভিয়ার বেসেরাকে অনুপ্রেরণাহীন রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেছেন হিলটন।
তার সমালোচকদেরও অভিযোগ, বেসেরা কেবল ডেমোক্র্যাট পরিচয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করছেন।
তবে বিশ্লেষক কুসারের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের প্রতি মানুষের সমর্থন কেবল দলীয় পরিচয়ের কারণে নয়; বরং দলটির নীতির কারণেও তা অর্জিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাট পরিচয়ের সঙ্গে এমন কিছু নীতি যুক্ত রয়েছে, যেগুলো ক্যালিফোর্নিয়ায় জনপ্রিয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো, অভিবাসীদের সুরক্ষা ও পরিবেশবিষয়ক বিধিবিধান। ট্রাম্পের নীতিগুলো এসব উদ্যোগের বিপরীতমুখী।
হিলটন এসব বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিচ্ছেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায় পেট্রল কর বাতিল ও বার্ষিক দেড় লাখ ডলারের কম আয়ের ওপর রাজ্য আয়কর প্রত্যাহার।
কুসার বলেন, সমালোচকেরা এসব প্রতিশ্রুতিকে লোকদেখানো পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
তবে কুসারের ভাষায়, ‘পিছিয়ে থাকা প্রার্থী হওয়ার কারণে তিনি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার স্বাধীনতা পেয়েছেন।’
ক্যালিফোর্নিয়ার সর্বশেষ রিপাবলিকান গভর্নর ছিলেন হলিউড অভিনেতা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার। তিনি ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
কুসারের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় আলাদা করে প্রতিষ্ঠা করতে কোনো রিপাবলিকান প্রার্থীর শোয়ার্জনেগারের মতো তারকাখ্যাতি ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।
তার মতে, হিলটনের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নেই।
এমারসন কলেজের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে বেসেরা হিলটনের চেয়ে ২৭ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন।
তবে সপ্তাহান্তে কয়েকশ মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত এক নির্বাচনী সমাবেশে হিলটন ব্রিটিশ উচ্চারণে বক্তব্য দেন।
তিনি এমন কয়েকজন ভোটারের গল্প শোনান, যারা আজীবন ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করলেও এবার তাকে ভোট দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
নিজে পিছিয়ে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেও হিলটন বলেন, ‘এটাই আমেরিকা। এটাই ক্যালিফোর্নিয়া। অবশ্যই আমরা অসম্ভবকেও সম্ভব করতে পারি!’
